Wednesday, September 30

মালিকদের লোভে লঞ্চে স্বাস্থ্যবিধি চিৎপটাং


প্রায় দুই মাস পর গণপরিবহন চালু হওয়ার দ্বিতীয় দিনেও মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বালাই নেই। সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে দক্ষিণবঙ্গগামী যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড়। যাতে বেড়েই চলছে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি। গতকাল বিকেল চারটায়।  ছবি: দীপু মালাকারকথা ছিল লঞ্চগুলোতে যাত্রীরা শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে ভ্রমণ করবেন। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবেন সবাই। কিন্তু সেই কথা রাখেননি লঞ্চমালিকেরা। গতকাল সোমবার ভিড়ে ঠাসা লঞ্চগুলোকে ঘাট ছাড়তে ও ঘাটে ভিড়তে দেখা গেছে। স্বাস্থ্যবিধি রক্ষার কোনো বালাই সেখানে ছিল না।

ঢাকার সদরঘাটের লঞ্চ টার্মিনাল, বরিশাল, চাঁদপুর, পটুয়াখালী ও বরগুনার লঞ্চঘাটগুলোতে ঘুরে প্রথম আলোর প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, কোথাও স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না।

অভিযোগ উঠেছে, এই মহামারির মধ্যেও কোথাও কোথাও ‘রোটেশন’ পদ্ধতিতে নির্ধারিত সংখ্যার চেয়ে কম লঞ্চ চালাচ্ছেন মালিকেরা, যাতে এক লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী বহন করা যায়। আর লঞ্চমালিকেরা বলছেন, অতিরিক্ত যাত্রীর চাপে এ অবস্থা হয়েছে।

গতকাল সোমবার দুপুর ১২টার দিকে ঢাকার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে ভিড়তে দেখা যায় শরীয়তপুর থেকে আসা ভিড়ে ঠাসা মিরাজ-৬ নামের লঞ্চটিকে। ঘাটে ভেড়ামাত্রই যাত্রীরা হুড়োহুড়ি, ঠেলাঠেলি করে নামতে শুরু করেন। অনেকের মুখে মাস্ক নেই। লঞ্চের তরুণ যাত্রী মোহাম্মদ হোসেন বলেন, পুরো লঞ্চে গাদাগাদি যাত্রী। তিনি কোনোরকমে দাঁড়ানোর জায়গা পান। সেখানে স্বাস্থ্যবিধির কোনো বালাই ছিল না। গত রোববারও এই লঞ্চটিকে গাদাগাদি করে যাত্রী নিয়ে আসতে দেখা যায়। এ ব্যাপারে মিরাজ-৬ লঞ্চটির ব্যবস্থাপক মো. সাঈদ প্রথম আলোকে বলেন, যাত্রীদের চাপ থাকায় অনেক সময় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা সম্ভব হচ্ছে না। আর ঘাটে লঞ্চ ভেড়ালে যাত্রীরা কে কার আগে নামবেন, সেই প্রতিযোগিতা শুরু করেন।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) উপপরিচালক কায়সারুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা সদরঘাটে দিনরাত দেখছি, খুব কম যাত্রী স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাচল করছেন। মুখে মাস্ক না দিয়ে হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।’

স্বাস্থ্যবিধি না মেনে চলায় একটি লঞ্চকে এক হাজার টাকা জরিমানা করেন বিআইডব্লিউটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালত।

ঢাকার মতো একই পরিস্থিতি চাঁদপুরেও। গতকাল বেলা ১১টার পর থেকে ঢাকামুখী হাজার হাজার যাত্রী চাঁদপুর ঘাটে এসে ভিড় জমান। লঞ্চগুলোও কোনো স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা না করেই ঘাট ছেড়েছে। এ ব্যাপারে আবে-জমজম লঞ্চের মালিক প্রতিনিধি বিপ্লব সরকার বলেন, ‘আমরা ভিড় ঠেকাতে নির্দিষ্ট সময়ের এক-দেড় ঘণ্টা আগে ঘাট ছাড়ছি। আর কোনোভাবে সামলানো যাচ্ছে না।’

চাঁদপুর নৌ পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা অনেক চেষ্টা করেও যাত্রীর চাপ কমাতে পারছি না। লঞ্চ কর্তৃপক্ষও তা সামাল দিতে পারছে না।’

রোটেশন পদ্ধতি

যাত্রীদের অতিরিক্ত ভিড় দেখা গেছে পটুয়াখালী লঞ্চঘাটেও। ঘাটে পৌঁছেও ভিড়ের চাপে লঞ্চে উঠতে পারেননি অনেক যাত্রী। লঞ্চের সংখ্যা কমিয়ে দেওয়ায় এই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বলে অভিযোগ যাত্রীদের।

পটুয়াখালী নদীবন্দর সূত্র জানায়, পটুয়াখালী-ঢাকা নৌপথ নয়টি লঞ্চ চলাচলের অনুমতি রয়েছে। একদিন চারটি ও অপরদিন পাঁচটি করে লঞ্চ চলাচলের নিয়ম রয়েছে। কিন্তু লঞ্চমালিকপক্ষ দীর্ঘদিন ধরে নিজেরা রোটেশন পদ্ধতিতে লঞ্চগুলো পরিচালনা করে আসছে। মালিক সমিতি নিজেরা লঞ্চের ট্রিপ কমিয়ে অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে লঞ্চে উঠতে বাধ্য করছে। এই অবস্থায় গতকাল পটুয়াখালী থেকে মাত্র দুটি লঞ্চ যাত্রী নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে গেছে।

পটুয়াখালী নদীবন্দরের সহকারী পরিচালক খাজা সাদিকুর রহমান বলেন, চারটি করে লঞ্চ থাকলে যাত্রীদের এই দুর্ভোগে পড়তে হতো না।

নৌপরিবহন অধিদপ্তরের নীতিমালা অনুয়ায়ী একজন যাত্রীর জন্য সাড়ে ১৩ স্কয়ার ফুট জায়গা বরাদ্দ আছে। এ হিসাব অনুযায়ী যাত্রী ধারণক্ষমতা নির্ধারণ করে সমুদ্র পরিবহন। কিন্তু এ হিসাবে যাত্রী পরিবহন করা হলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে এক যাত্রী থেকে আরেক যাত্রীর শারীরিক দূরত্ব তিন ফুটের বেশি থাকার কথা। কিন্তু লঞ্চমালিকেরা কোনো নীতিমালারই ধার ধারছেন না। মহামারির স্বাস্থ্যবিধিকেও আমলে নিচ্ছেন না।

বরগুনা সদর ও আমতলী লঞ্চঘাটেও গতকাল ভিড় আর ঠেলাঠেলির চিত্রই দেখা গেছে।

গতকাল সকালে এমভি পূবালী-১ লঞ্চটি ঢাকা থেকে বরগুনায় আসে। সোমবার বেলা তিনটার দিকে ঘাটে গিয়ে দেখা যায় লঞ্চটি কানায় কানায় পূর্ণ। চারটার দিকে ছেড়ে যাওয়া ওই লঞ্চ এরপর আবার কাকচিড়া, ফুলঝুড়ি, রামনা, বামনা, বেতাগী—এই পাঁচ ঘাটেও যাত্রী তুলবে। তবে লঞ্চের ঘাট সুপারভাইজার এনায়েত হোসেনের দাবি, তাঁরা স্বাস্থ্যবিধি বজায় রেখে যাত্রী তুলেছেন।

করোনা পরিস্থিতিতে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর গত রোববার ৬৬ দিন পর লঞ্চ চলাচল শুরু হয়। রোববার সদরঘাট টার্মিনাল পরিদর্শনে এসে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ৯৫ শতাংশ মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছেন। নৌপথে যাত্রী পরিবহন যদি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়, তাহলে সরকারের এই সিদ্ধান্তই শেষ সিদ্ধান্ত নয়। ১৫ দিনের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সরকার সিদ্ধান্ত নেবে।





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *